ইসলাম

শবে বরাত কবে ২০২২? শবে বরাত কি, তাৎপর্য ও গুরুত্ব এবং করণীয় ও বর্জনীয়

আসসালামু আলাইকুম ভিজিটর বন্ধুরা আজ আমরা কথা বলবো শবে বরাত উপলক্ষে। ইসলাম ধর্মের অনুসারী মুসলিম ভাইয়েরা শবে বরাত কবে, কত তারিখ এবং শবে বরাতের নামাজ এর নিয়ম, দোয়া ও ফজিলত সম্পর্কে অনুসন্ধান করেন। তাই ইসলামিক ক্যালেন্ডার চাদেঁর সাথে সম্পর্কিত, তাই শবে বরাত কবে ২০২২ সালে হবে, তা নিয়ে সবার অনেক আগ্রহ থাকে। এই দিনে মুসলমান ভাইয়েরা বিভিন্ন ইবাদাত ও আমল করে থাকেন, যা, আমরা আজ বিস্তারিত আলোচনা করবো.

আমাদের আজকের পোষ্ট থেকে আপনারা জানতে পারবেন, শবে বরাত কি? শবে বরাত কবে হবে? শবে বরাতের গুরুত্ব, তাৎপর্য ও ফজিলত, বিভিন্ন আমলের নিয়ম ও দোয়া। হিজরি বর্ষের শাবান মাসের ১৪ তারিখের দিবাগত রাতটি মুসলমান ভাইয়েরা সৌভাগ্যের রজনী হিসেবে ইবাদত ও আমল করে থাকেন। এই রাতে মহান আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের জন্য অশেষ রহমতের দরজা খুলে দেন।

শবে বরাত

শবে বরাত: শবে বরাত বা মধ্য-শা’বান হচ্ছে (আরবি: نصف شعبان‎, প্রতিবর্ণী. নিসফে শাবান‎) বা লাইলাতুল বরাত । হিজরী শা’বান মাসের ১৪ ও ১৫ তারিখের মধ্য রাতে শবে বরাত পালিত মুসলিমদের গুরুত্বপূর্ণ একটি রাত। ইসলামীক বিশ্বাস মতে, এই রাতে আল্লাহ তার বান্দাদেরকে বিশেষভাবে ক্ষমা করে দেন।

এই মহিমান্বিত রজনীতে ধর্মপ্রাণ মুসলমান ভাইয়েরা পরম করুণাময়ের অনুগ্রহ লাভের আশায় নফল নামাজ, পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত, জিকিরে করে থাকেন। অনেকে রোজা রাখেন, দান-খয়রাত করেন। অতীতের সকল গুনাহের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা ও ভবিষ্যৎ জীবনের কল্যাণ কামনা য় মোনাজাত করে থাকেন। আবার শবে বরাত মাহে রমজানের আগমনী বার্তা দেয়।

শবে বরাত কবে ২০২২

ইসলামিক ক্যালেন্ডার শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতে শবে বরাত উদযাপিত হয়। তাই ইলামিক মাসের শুরু ও শেষ চাদেঁর সাথে সম্পর্কিত, শবে বরাত প্রতি বছর ইংরেজি তারিখে এক থাকেনা। এবছর শবে বরাত ১৮ মার্চ শুক্রবার (১৪ শাবান ১৪৪৩, ৪ চৈত্র ১৪২৮) দিবাগত রাতে পবিত্র শবে বরাত উদ্‌যাপন করা হবে।
৩ মার্চ ২০২২ সন্ধ্যায় ইসলামিক ফাউন্ডেশন বায়তুল মোকাররম থেকে জাতীয় মসজিদের সমাবেশে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির বৈঠক এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন ধর্ম মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. ফরিদুল হক খান।
শবে বরাত শব্দের অর্থ কি ?
শবে বরাত ফারসি শব্দ থেকে এসেছে। ‘শব’ মানে রাত, ‘বরাত’ মানে মুক্তি। শবে বরাত কথাটির অর্থ হচ্ছে মুক্তির রাত। শবে বরাতের আরবি শব্দ হলো ‘লাইলাতুল বারাআত’। হাদিস শরিফ অনুযায়ী যাকে ‘নিসফ শাবান’ বা ‘শাবান মাসের মধ্য দিবসের রজনী’ বলা হয়ে থাকে। ভারতীয় উপমহাদেশ, পারস্যসহ পৃথিবীর অনেক দেশের ফারসি, উর্দু, বাংলা, হিন্দিসহ নানা ভাষায় যা ‘শবে বরাত’ নামেই অধিক পরিচিত।

শবে বরাতের তাৎপর্য ও ফজিলত

কোরআনুল কারিম এ এসেছে, ‘হা-মিম! শপথ! উজ্জ্বল কিতাবের, নিশ্চয়ই আমি তা নাজিল করেছি এক বরকতময় রাতে; নিশ্চয়ই আমি ছিলাম সতর্ককারী। যাতে সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নির্ধারিত হয়। এ নির্দেশ আমার (আল্লাহ) তরফ থেকে, নিশ্চয়ই আমিই দূত পাঠিয়ে থাকি।’ (সুরা-৪৪ দুখান, আয়াত: ১-৫)।

মুফাসসিরিনগণ বলেন: এখানে ‘লাইলাতুম মুবারাকা’ বা বরকতময় রজনী বলে শাবান মাসে পূর্ণিমা রাতকেই বোঝানো হয়েছে। (তাফসিরে মাজহারি, রুহুল মাআনি ও রুহুল বায়ান)। হজরত ইকরিমা (রা.) প্রমুখ কয়েকজন তাফসিরবিদ থেকে বর্ণিত আছে, সুরা দুখান–এর দ্বিতীয় আয়াতে বরকতের রাত বলে শবে বরাতকে বোঝানো হয়েছে। (মাআরিফুল কোরআন)।

হাদিস শরিফে আছে, ‘হজরত মুআজ ইবনে জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তাআলা অর্ধশাবানের রাতে মাখলুকাতের দিকে রহমতের দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ছাড়া আর সবাইকে ক্ষমা করে দেন।’ (ইবনে হিব্বান: ৫৬৬৫, ইবনে মাজাহ: ১৩৯০, রাজিন: ২০৪৮; ইবনে খুজাইমা, কিতাবুত তাওহিদ, পৃষ্ঠা: ১৩৬, মুসনাদে আহমদ, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৭৬)।
হজরত আয়শা সিদ্দিকা (রা.) বলেন, একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) নামাজে দাঁড়ালেন এবং এত দীর্ঘ সিজদা করেছিলেন যে আমার ধারণা হলো তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। আমি তখন উঠে তাঁর পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলি নাড়া দিলাম, তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুলি নড়ল; তিনি সিজদা থেকে উঠলেন এবং নামাজ শেষ করে আমাকে লক্ষ করে বললেন, “হে আয়শা! তোমার কি এ আশঙ্কা হয়েছে?”
আমি উত্তরে বলেছিলাম, ‘ইয়া রাসুলুল্লাহ (সা.), আপনার দীর্ঘ সিজদা থেকে আমার আশঙ্কা হয়েছিল আপনি মৃত্যুবরণ করেছেন কি না।’ নবীজি (সা.) তখন বললেন, ‘তুমি কি জানো এটা কোন রাত?’ আমি বললাম, আল্লাহ ও আল্লাহর রাসুলই ভালো জানেন।’ তখন নবীজি (সা.) বললেন, ‘এর হলো অর্ধ শাবানের রাত। এ রাতে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের প্রতি মনোযোগ দেন, ক্ষমাপ্রার্থনাকারীদের ক্ষমা করে দেন, অনুগ্রহপ্রার্থীদের অনুগ্রহ করেন। আর বিদ্বেষ পোষণকারীদের তাদের অবস্থাতেই ছেড়ে দেন।’ (শুআবুল ইমান, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩৮২)।

শবে বরাতের করণীয় ও বর্জনীয়

শবে বরাত এর রাত নিয়ে প্রচুর গবেষণা, মনীষীদের উক্তি ও পক্ষে-বিপক্ষে নানারকম মতামত রয়েছে। একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে কুরআন ও সুন্নাহকে অনুসরণ করে আমাদের প্রত্যেকের কিছু করণীয় ও বর্জনীয় থাকে শবে বরাতকে কেন্দ্র করে। সেই করণীয় ও বর্জনীয় আমরা খেদমতে উপস্থাপন করছি।
শবে বরাতের করণীয়:
=> কুরআন হাদিস সম্পর্কে সঠিক ‌জ্ঞান অর্জন করা মুসলমান এর জন্য জোর প্রচেষ্টা করা। কেননা এর মাধ্যমেই আমরা সব বির্তকের অবসান ঘটিয়ে একটি সুন্দর সুশিল সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারবো।
=> শবে বরাতের রাত সম্পর্কে একটি সহিহ হাদিস এ এসেছে যা সুনানে ইবনে মাজাহ এর ইকামাতুস সালাত অধ্যায়ে আবু মুসা আল আশআরী থেকে বর্ণিত যে, রাসূল (স) বলেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ মধ্য শা’বানের রাতে সমস্ত সৃষ্টির দিকে বিশেষ নজর দেন ও মুশরিক (আল্লাহর সাথে শিরককারী) এবং মুশাহিন (হিংসুক) ব্যতীতসকলকে ক্ষমা করে দেন।
এবং এই হাদিসের আলোকে আমাদের করণীয় এই যে, আমরা আমাদের জীবনের প্রতিটি দিনই হিংসা ও আল্লাহর সাথে শিরক করা থেকে বেঁচে থাকবো। যদি এ রাতে আমি ঘুমিয়েও থাকি তবে আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করে দেবেন।
এ রাতে যেমনভাবে আমরা ইবাদত করার জন্য বিশেষভাবে উদগ্রিব হই আমাদের উচিত রাতের বরকতময় সময়ে ইবাদত করার জন্য উদগ্রিব হওয়া। কেননা প্রতিটি রাতেই একটি বিশেষ সময় আছে যখন আল্লাহ তায়ালা আমাদের ডেকে ডেকে বলতে থাকেন যে, কার কী দরকার সে যেন আমার কাছে চায়, আমি দেবো। কে আছো ক্ষমা চাইবার আমি মাফ করে দেবো। কে আছে আমাকে ডাকবে আমি তার ডাকে সাড়া দেবো। আর তা হলো প্রতি রাতের এক-তৃতীয়াংশ এর শেষ অংশে যা ফজর পর্যন্ত চলতে থাকে। হাদিসটি সহিহ মুসলিমের মুসাফিরের সালাত অধ্যায়ে হযরত আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত হয়েছে। সেই অর্থে প্রতিটি রাতই কিন্তু ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য সুযোগ নিয়ে আসে একথা আমরা অকপটে বলতে পারি।
=> এই মহামন্তি রাতে নফল নামাজ, কুরআন তেলাওয়াত ও তাসবিহ তাহলিল করা যেতে পারে। এছাড়াও এ রাতে কোনো ইবাদত করলে তা নফল হিসেবেই গণ্য হবে। নফল তবে সালাত বা ইবাদত ঘরেই করা বেশি ভালো। মাসজিদের জড়ো হয়ে এটাকে আনুষ্ঠানিক রূপ দিলে তা অবশ্যই বিদয়াত বলে গণ্য করা হবে যা একটি পাপ। তবে অবশ্যই কিছু সময় ঘুমাতে হবে যেন ফজরের নামাজ জামায়াতে আদায় করতে পারি। যদি ঘুমের কারণে নামাজ বাদ পড়ে যায় তবে তা রাত্রের ইবাদতের অর্জনকে ম্লান করে।
=> মূলত সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ রাত হলো রমজান মাসের শেষের ১০ দিন। এই রাতকে যেন আমরা সেই সমস্ত রাত থেকে বেশি মর্যাদাপূর্ণ রাত না ভাবি সেই দিকে খেয়াল অবশ্যই রাখতে হবে।
=> অবশ্যই এক কথায় দ্বীনের জ্ঞান রাখতে হবে । তবেই আমাদের জ্ঞান আমাদের এই রাতে করণীয় সম্পর্কে আমাদের আমল করতে বেশি উৎসাহিত করবো। পাশাপাশি বর্জনীয় বিষয়গুলোও আমাদের সামনে চলে আসবে।
শবে বরাতের বর্জনীয়:
=> মসজিদে সবাই একত্রিত হয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দোয়া করা, ভিড় করা, এক কথায় আনুষ্ঠানিক সকল কাজ এ রাতে অবশ্যই বর্জন করা করতে হবে।
=> লাইটিং করা, হালুয়া রুটি খাওয়া, আতশবাজি ফুটানো, বিশেষ রজনী হিসেবে দলে দলে আনন্দের সঙ্গে উদযাপন করা থেকে বিরত থাকতে হবে ।
=> শবে বরাতকে কবর জিয়ারতের জন্য বিশেষভাবে গ্রহণ করা।
=> ইসলাম স্বীকৃত নয় এমন কোনো কাজ করা যাবে না।প্রত্যেকটি কাজ সম্পর্কে সচেতন হওয়া ও তা বর্জন করা।
=> শিরক থেকে নিজেকে বাঁচাতে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা করা। পাশাপাশি হিংসা-বিদ্বেষ থেকে নিজেকে পুরোপুরি মুক্ত রাখা। ফজরের জামায়াতের সময় ঘুমানো।
=> সারারাত জাগ্রত থাকা।
সর্বপরি আমাদের সারা বছর শিরক ও হিংসা থেকে বেঁচে থেকে রাতে আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করার অভ্যাস করাটাই হবে এই রাতের আসল উদ্দেশ্য ও অর্জন। মহান আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.